মোহাম্মদ আব্দুল হক::>
অনেকের মনে প্রশ্ন ও বিস্ময় জাগে আমেরিকা কি এতোটাই শক্তিশালী যে তার সাথে কেউ যুদ্ধে জয়ী হতে পারে না! দিকে দিকে একের পর এক যুদ্ধে আমেরিকার নাম এমনভাবে জড়িয়ে আছে যেখান থেকে সাধারণ মানুষের মনে এ ধরনের প্রশ্ন আসাটা স্বাভাবিক। স্মরণকালের ইরাক যুদ্ধ, আফগানিস্তান যুদ্ধ, গাজা-প্যালেস্টাইন, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধ সবখানেই আমেরিকা জড়িয়ে যায়। তাহলে আমেরিকার ইতিহাসে কি যুদ্ধে পরাজয় বা ব্যর্থতার কোনো ছিটেফোঁটাও নেই? এই আমেরিকা প্রথম থেকে কেমন ছিল সেটা সামনে নিয়ে আসলে এবং এরপর কয়েকটি যুদ্ধে আমেরিকার পরিণতি কি হয়েছে তার একটা সংক্ষিপ্ত আলোচনা করলে মোটামুটি ধারণা পেতে সহজ হবে। শুরুতেই জেনে রাখা দরকার, আজকের এই আমেরিকা বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এক সময় পরাধীন ছিল। ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই এই আমেরিকা ব্রিটিশ শাসনের কবল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা লাভ করে। এই স্বাধীনতা অর্জনের প্রেক্ষাপট ছিল এ রকম - ফিলাডেলফিয়ার কন্টিনেন্টাল কংগ্রেসের প্রতিনিধিরা ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ গ্রহণ করেন। ঐতিহাসিক ওই দলিলটি থমাস জেফারসন লিখেছিলেন। সেই সূত্রে বর্তমানে আমেরিকা এই দিনটিকে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করে। তবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেও প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতা অর্জনে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। জর্জ ওয়াশিংটন, যিনি পরবর্তীতে আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট হন, তার নেতৃত্বে ১৭৮৩ সাল পর্যন্ত আমেরিকার ১৩টি উপনিবেশ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। দীর্ঘ যুদ্ধের পরে ১৭৮৩ সালে ঐতিহাসিক ‘প্যারিস চুক্তি’ স্বাক্ষরের মাধ্যমে ব্রিটেন আনুষ্ঠানিকভাবে আমেরিকাকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন হলেও, আমেরিকার স্বাধীনতার স্থপতি বা ফাউন্ডিং ফাদার্স হিসেবে স্বীকার করা হয় কয়েকজনকে- জন অ্যাডামস, বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন, আলেকজান্ডার হেমিল্টন, জন জে, থমাস জেফারসন, জেমস ম্যাডিসন এবং জর্জ ওয়াশিংটন। শুরুতে মোট ১৩টি উপনিবেশ নিয়ে গঠিত হলেও বর্তমানে আমেরিকা মোট ৫০টি অঙ্গরাজ্য নিয়ে বিস্তৃত। এখন প্রশ্ন জাগে, এই- যে আমেরিকা ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তির পরে বর্তমানে একের পর এক যুদ্ধে জড়িয়ে লড়ে যাচ্ছে, সেটি কি কখনও কারো কাছে পরাজিত হয়েছে? একটি সহজ জবাব হলো - এখন পর্যন্ত আমেরিকার মূল ভূখ-ে আক্রমণ করে কোনো দেশ তাদেরকে পরাজিত করেছে এমন রেকর্ড নেই। তবে হ্যাঁ, যুদ্ধের ফলাফল বিবেচনায় ও রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনকে গুরুত্ব দিয়ে কয়েকটি যুদ্ধে আমেরিকা ব্যর্থ বা পরাজিত হয়েছে বলা হয়। উদাহরণ হিসেবে ভিয়েতনাম যুদ্ধের (১৯৫৫ - ১৯৭৫) কথা বলা যায়। অতি আধুনিক উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্রশস্ত্র থাকা সত্বেও উত্তর ভিয়েতনামের গেরিলা বাহিনীর কাছে আমেরিকা যুদ্ধ করে তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। ওই যুদ্ধকে আমেরিকার সামরিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড়ো ধাক্কা হিসেবে দেখা হয়। ১৯৭৩ সালে আমেরিকা তার সেনা প্রত্যাহার করে নেয় এবং ১৯৭৫ সালে উত্তর ভিয়েতনাম দক্ষিণ ভিয়েতনাম দখল করে নেয়। আমেরিকার মিত্র শক্তির ঐতিহাসিক পতন ঘটে। এরপর উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় আফগানিস্তান যুদ্ধ (২০০১ - ২০২১) - ঐতিহাসিক নাইন-ইলেভেনের পরে আমেরিকা ক্ষিপ্ত হয়ে তালেবান দমনের উদ্দেশ্য নিয়ে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এ অঞ্চলে দীর্ঘ টানা বিশ বছর যুদ্ধ করে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে, ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরে চাপ সামলাতে না-পেরে ২০২১ সালে আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করে। আমেরিকা সরে যাওয়ার পরপরই এ অঞ্চলের তালেবানরা পুনরায় ক্ষমতা দখল করে নেয়। বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এটি ছিল আমেরিকার কৌশলগত পরাজয়, যা কার্যত যুদ্ধে আমেরিকার ব্যর্থতাকে ইঙ্গিত করে। স্মরণ করতে হয়, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ১৮১২ সালের যুদ্ধ যা ইতিহাসে ‘ওয়ার অব ১৮১২’ - এই যুদ্ধে আমেরিকার রাজধানী ওয়াশিংটন ডি.সি. আক্রান্ত হয়েছিল এবং হোয়াইট হাউসে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধ একটি চুক্তির মাধ্যমে শেষ হয়ে যায়, কোনো পক্ষ কোনো বিশেষ ভূখ- জয় করতে পারেনি। বলা হয়, আমেরিকার জন্য এটি ছিল অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। আরেকটি যুদ্ধের কথা উল্লেখ করতে হয়, কোরিয়া যুদ্ধ (১৯৫০ - ১৯৫৩) - এই যুদ্ধটিও কোনো রকম সফল মীমাংসা ছাড়া শেষ হয়ে যায়। উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া তাদের পূর্ববর্তী সীমানা নিয়েই বিভক্ত থেকে যায়। এ যুদ্ধে আমেরিকা দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিল। এখানে আমেরিকা উত্তর কোরিয়াকে পুরোপুরি পরাজিত করতে ব্যর্থ হওয়ায়, বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণে এটিকে একটি অমীমাংসিত বিষয় হিসেবে দেখা হয়। আমেরিকার আরেকটি ব্যর্থতা হলো সোমালিয়ায় যুদ্ধ। ১৯৯৩ সালে সোমালিয়ার মোগাদিসুতে আমেরিকান সেনাদের যুদ্ধাভিযান ব্যর্থ হয়েছিলো, যা ‘ব্ল্যাক হক ডাউন’ ঘটনা নামে পরিচিত। এখানেও আমেরিকা তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়েছিল। এখানে যুদ্ধ ও আমেরিকা প্রসঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় আমেরিকার ভূমিকা তোলে ধরা যেতে পারে। ১৯৭১ সালে আমেরিকার ভূমিকা ছিল বেশ জটিল। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে যখন পাকিস্তানের পরাজয় নিশ্চিত হয়ে যায় তখন একদিকে পাকিস্তানকে সহায়তা দিতে এবং পাশাপাশি যেহেতু ভারত আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে সহযোগিতা করেছে তাই ভারতকে চাপে ফেলতে আমেরিকা বঙ্গোপসাগরে তার শক্তিশালী সপ্তম নৌবহর ‘সেভেনথ ফ্লিট’ পাঠিয়েছিল। সে সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির জোরালো সমর্থন ও বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নের হস্তক্ষেপের কারণে আমেরিকা সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে পারেনি। একই সাথে মার্কিন সরকারের অবস্থানের বিপরীতে সেদেশের সাধারণ মানুষ ও শিল্পীরা বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তখন প-িত রবি শংকরের অনুরোধে বিখ্যাত বিটলস ব্যান্ডের সদস্য জর্জ হ্যারিসন নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ আয়োজন করেন। এই ঘটনা বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বিষয়টি দীর্ঘ আলোচনার দাবি রাখলেও পরিসর স্বল্পতা বিবেচনা করে সমাপ্তি টানা যায়, এই-যে ইসরায়েল প্যালেস্টাইন ইস্যুসহ ইরাক-ইরান ইত্যাদি দেশে বিভিন্ন সময় ধরে আমেরিকা তার সামরিক শক্তি নিয়ে হামলা করে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, এখন পর্যন্ত এর কোনোটিতেই সুনির্দিষ্ট মীমাংসার পথে আমেরিকার জয় লক্ষ্য করা যায় না। বরং বর্তমান বিশ্বে আমেরিকা সামরিক শক্তির ক্ষেত্রে শীর্ষ অবস্থানে থাকলেও বারবার যুদ্ধে জড়িয়ে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং দীর্ঘদিন যুদ্ধ করতে করতে শেষ পর্যন্ত ক্লান্ত হয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। যে প্রশ্ন মনে জাগা স্বাভাবিক, আমেরিকা কি তার স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত কখনও কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পরাজিত হয়েছে? আশা করছি এই সংক্ষিপ্ত আলোচনায় এমন প্রশ্নের জবাব ফুটে উঠেছে।
[লেখক : মোহাম্মদ আব্দুল হক, কলামিস্ট ও কথাসাহিত্যিক]
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
আমেরিকা কখনও যুদ্ধে হেরেছে?
- আপলোড সময় : ১৮-০৩-২০২৬ ০৪:১৭:১০ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৮-০৩-২০২৬ ০৪:১৮:২৩ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সুনামকন্ঠ ডেস্ক